জামশেদপুরের পুজো বাঙালি ও বাংলার শিল্পবোধের ছোঁয়াতেই শোধন হয়
(বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় / জামশেদপুর)
‘যেখানে বাঙালি সেখানে অসুরদলনী’ এই কথাটি আজ বিদেশ বিভূঁইয়েও চিরন্তন সত্যের পর্যায়ে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাভাষী অধ্যুষিত জামশেদপুর ও তার উপকণ্ঠে এই মহাপুজো ডালপালা মেলেছে বিস্তর। গত দুই দশকে ইস্পাতনগরী জামশেদপুরে পুজোর সংখ্যা বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বাঙালি-অবাঙালি সকলেই এই মহোৎসবে একেবারে হৈ-হৈ করে শামিল। জামশেদপুরের কেন্দ্রীয় দুর্গাপূজা সমিতির হিসেব অনুযায়ী গত বছর শহর জামশেদপুরে পুজোর সংখ্যাটা ছিল ২৬৭, এ বছর তা ২৮০।
কলকাতা ও হাওড়ার কথা বাদ দিলে ভারতবর্ষে ‘সম্ভবত’ জামশেদপুরই এমন একমাত্র শহর যেখানে সংখ্যায় এত বেশি সংখ্যায় পুজো অনুষ্ঠিত হয়। জেলার প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের বহু জেলাকে সব দিক থেকে ছাপিয়ে যেতে পারে ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার শারদোৎসব। জামশেদপুর ছাড়াও এই জেলার ঘাটশিলা, বহড়াগোড়া, মোসাবনী, চাকুলিয়া, ধলভূমগড় প্রভৃতি মফস্বল শহরেও সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শতবর্ষ অতিক্রান্ত ঐতিহ্যবাহী পুজো যেমন রয়েছে তেমনি ‘থিম’ পুজোর হাওয়াও ভিড় করেছে এসব অঞ্চলের পুজোয়। আর যেখানে ইস্পাতনগরী জামশেদপুরের প্রশ্ন সেখানে রূপ, আয়তন, তথা বাজেটের নিরিখে দেশের অন্যান্য বড় শহরের পুজোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাল্লা দিতে পারে। লাখ টাকারও বেশি বাজেটের পুজোর সংখ্যা এখানে কম করেও শতাধিক এবং গোটা ৩০ পুজোর জৌলুস এমনই, যে সেই পুজোগুলিকে ‘ঘোড়া’ করে গলাবাজি করা যেতে পারে কলকাতার দুর্গা বা মুম্বাইয়ের গণপতি উৎসবের সঙ্গে।
ইচাগড়ের বিধায়ক অরবিন্দ সিং এর নেতৃত্বে আদিত্যপুরে জয়রাম স্পোর্টিং ক্লাবের পুজো, ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মন্ত্রী দুলাল ভুঁইয়ার পৌরহিত্যে হিউম পাইপ সার্বজনীন, কাশিডি-র ঠাকুর ধুরন্ধর সিং প্যারা সিং সমিতির পুজো, রাণিকুদারের হিন্দ ক্লাবের পুজো, কদমা নিউ ফার্ম এরিয়ার পুজো এছাড়াও সোনারী, টেলকো, মানগোর, বারিডি, সাকচির একাধিক পুজো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহ্যবাহী পুজোর তালিকায় অনেক নামের ভীড় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামকৃষ্ণ মিশন, যুগবশিষ্ট সংঘ, সাকচি দুর্গাবাড়ি, সার্কিটহাউস-নর্দানটাউন, কনট্রাকটর এরিয়া, বিশ্বজিৎ মনিমালা, ইভিনিং ক্লাব, সাকচি সার্বজনীন (বেঙ্গলক্লাব), টেলকো সবুজ সংঘ, কদমা দুর্গাবাড়ি, বারোদুয়ারি সার্বজনীন, প্রমথনগর সার্বজনীন, উলিয়ান সর্বজনীন, ওল্ড ফার্ম এরিয়া, সোনারী তরুন সংঘ প্রমুখ।
‘‘জামশেদপুরের বারোয়ারি দুর্গা পুজোর ইতিহাস অতি প্রাচীন না হলেও শতবর্ষ অতিক্রান্ত। বস্তুত জামশেদপুর জামশেদপুর হয়ে ওঠার আগেই এখানে দেবী বন্দনার সূত্রপাত ঘটে এবং তা অবশ্যই একজন বাঙালির হাত ধরে। এ সম্পর্কে একটি সূত্র থেকে জানা যায় টাটানগর রেল স্টেশন লাগোয়া ট্রাফিক কলোনিতে আজ থেকে ১০৭ বছর আগে সর্বপ্রথম বারোয়ারি পুজো শুরু করে ছিলেন তৎকালীন ‘কালিমাটি’ (অধুনা টাটানগর জংশন) এর কর্মচারী সুরেন্দ্র সেনগুপ্ত ১৯০৫ সালে’’ সেই সময় সিংভূমের এই খনিজ-উর্বর প্রান্তরে টাটা কোম্পানির গোড়াপত্তন হয়নি। টাটা কোম্পানির গোড়াপত্তন হয় ১৯০৭ সালে। তখন জামশেদপুর পরিচিত হত ‘সাকচি’ নামে। রেল স্টেশনটির নাম ছিল ‘কালিমাটি’। এর পর ১৯১৯ সালে ওল্ড এল টাউন দুর্গাপূজা কমিটির নামে একটি সমিতি গঠন করে পুজো শুরু করেন স্থানীয় বাঙালিরা — রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ সোসাইটির তত্বাবধানে পুজোটি অনুষ্ঠিত হতে থাকে সাকচি বয়েজ ক্লাবে। সে বছরই টাটা মেইন হাসপাতালের চিফ মেডিক্যাল অফিসার শান্তিরাম চক্রবর্তীর পৌরহিত্যে জামশেদপুর দুর্গাপূজা কমিটি গঠন করে পুজো হয় বিষ্টুপুর কিউ রোডে জামশেদপুর বয়েজ অ্যাসোসিয়েশনের ছত্রছায়ায়। বর্তমানে রামকৃষ্ণ মিশনের পুজোটি অনুষ্ঠিত হয় বিষ্টুপুরস্থ মিশনের আটচালায়। বার্মামাইন্স এর বাঙালি দুর্গা পূজা সমিতি, উলিয়ান সার্বজনীন, ওল্ড ফার্মএরিয়া, সার্কিট হাউস, কন্ট্রাকটর এরিয়ার পুজোগুলিও জামশেদপুরের প্রথম দিকের পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম। সূত্রটি মারফত আরও জানা যায় ‘জামশেদপুর কেন্দ্রীয় দুর্গা পূজা সমিতির গঠন হয় ১৯২৩ সালে (উল্লেখযোগ্য এই কেন্দ্রীয় সমিতির আওতায় জামশেদপুরের পুজোগুলি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে) সমিতির প্রথম দুই কর্তা ছিলেন রমেন হালদার ও টাটা ফাউন্ড্রীর কর্ণধার নগেন রক্ষিত। লক্ষণীয় বিষয় সেই সময় জামশেদপুরে হাতেগোনা মাত্র ৫টি দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হত। আজ তা বাড়তে বাড়তে ৩০০ ছুঁই ছুঁই। একশভাগ বাঙালিদের দ্বারা পরিচালিত পুজোর পাশাপাশি, ওড়িয়া ভাষীরা বহু পুজোর আয়োজন করে আসছে। তার মধ্য অন্যতম সাকচির উৎকল অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গা বন্দনা। কদমা-র উৎকলের পুজোটিও জামশেদপুরের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়াও শুধু মাত্র নেপালীদের দ্বারা, হরিজন সম্প্রদায় দ্বারা ও হিন্দিভাষাভাষী (মূলত বিহারী) পরিচালিত একাধিক পুজো অনুষ্ঠিত হয় শিল্পনগরী জামশেদপুরে।
জামশেদপুরের অর্থনীতি মূলত টাটা কোম্পানি ও তাকে ঘিরে গজিয়ে ওঠা পোক্ত অর্থব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল তাই ‘কাশফুল ফুটুক বা না ফুটুক টাটা কোম্পানির বোনাসের ঢাকে কাঠি পড়া মাত্রই পুজোর গন্ধ ভিড় করে এখানে। এ বছরেও তার ব্যতিক্রম হবে না। বোনাসের ঘোষণা মাত্র পুজোর আমেজ একেবারে তুঙ্গে উঠবে। আপাতত সোনালী রোদ্দুর ও তুলো পেঁজা মেঘ ও কাশের অবস্থান মেপে কুমোরটুলি থেকে মণ্ডপের কাঠামো, দোকান বাজারসহ সব কিছু একেবারে চাতক নজরে তাকিয়ে রয়েছে। এই পুজো পুজো আমেজ থাকবে কালীপুজো পেরিয়ে ‘ছট’ পুজো পর্যন্ত।
অপবাদ রয়েছে বাঙালিরা নাকি কাঁকড়া সুলভ আচরণে জর্জরিত, একতার অভাব আজকের বাঙালির ‘মোদের গরব মোদের আশা...’ সর্বোপরি সরকারি অবহেলায় নিরন্তর ধুলো জমছে বাঙালির ভাষা সংস্কৃতির ওপর কিন্তু তবুও বাঙালির প্রাণের পরব দুর্গোৎসবে জামশেদপুরে ‘বাঙালিয়ানার’ কোনও কমি নেই — অন্তত পুজোর মাসটাতে তো বটেই। পঞ্চমী থেকে দশমী ছাড়িয়ে কালী পুজো পর্যন্ত ‘ষোলয়ানা বাঙালিয়ানা’ বলতে যা যা বোঝায় সবই মিলবে এ শহরের আনাচে কানাচে — অবাঙালি দোকানদার, পাড়ার দর্জি, শিল্পী, চাঁদার বিল বই হাতে অবাঙালি যুবকটি পর্যন্ত সকলেই যেন এই সময়টায় বড্ড বেশি বাঙালি হবার চেষ্টা করে। বিশাল বাজেটের পুজোগুলির উদ্যোক্তা মূলত অ-বাঙালিরাই তবুও সে-সব আয়োজন বাঙালি ও বাংলার শিল্পবোধের ছোঁয়াতেই শোধন হয়।
পরিশেষে বলতে হয় জামশেদপুরের পুজোর নিজস্ব মৌলিকতার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় কলকাতা, কাঁথি, চন্দননগর, কালনা, বাগনান এমনকি পূর্ব বাংলারও গন্ধ। তাই শারদ মরশুমে খড়কাই-সুবর্ণরেখাই জামশেদপুরের বাঙালির কাছে কালীঘাটের গঙ্গা।।
পরিশেষে বলতে হয় জামশেদপুরের পুজোর নিজস্ব মৌলিকতার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় কলকাতা, কাঁথি, চন্দননগর, কালনা, বাগনান এমনকি পূর্ব বাংলারও গন্ধ। তাই শারদ মরশুমে খড়কাই-সুবর্ণরেখাই জামশেদপুরের বাঙালির কাছে কালীঘাটের গঙ্গা।।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন