জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা দেশবাসীর
কর্তব্য
বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
১৫ই অগাস্ট, জাতীর
জীবনে এক পবিত্র এবং গর্ব করার মত স্মরণীয় দিবস। কষ্টার্জিত স্বাধীনতা
রক্ষায় আমরা প্রত্যেকে কতটা আন্তরিক বা ইংরেজ এ মুলুক ছেড়ে বিদায় হলেও সত্যিই কি
দেশবাসী স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছেন ? এ প্রশ্ন অনেকেরই। তবে এখানে আলোচনা জাতীয়
পতাকার সম্মান-অসম্মান ঘিরে।
স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উত্তোলনের
সময়, নমিত করা ইত্যাদি বিষয়ে বিধি নিষেধ রয়েছে
ত্রিবর্ণ পতাকার জন্য। সেই নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মত যথেষ্ট শিক্ষা তথা পরিবেশ যে
কোনও কারণেই হোক আসমুদ্রহিমাচলের বেশিরভাগ মানুষের কপালে জোটে না। কিন্তু শিক্ষিত অশিক্ষিত
ভারতবাসী যারা ঘটা করে স্বাধীনতা দিবস পালন করেন, তাঁরা
অন্তত: এটুকু তো নিশ্চয়ই বোঝেন, যে জাতীয় পতাকা ছেঁড়া, টুকরো কিম্বা অবাঞ্ছিত অবস্থায় রাস্তায় গড়াগড়ি খেলে তাতে তার চরম
অবমাননা করা হয়। তবুও কিন্তু জানতে-অজান্তে প্রায়শই জাতীয় পতাকার সম্মান ভূলুণ্ঠিত
হচ্ছে এ দেশের যত্র-তত্র।
‘‘চলচ্চিত্রে রূপোলী পর্দায় নায়ক কর্তৃক জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষার্থে বীর
বিক্রমে শত্রু নিধন কিম্বা তেরঙ্গা উঁচিয়ে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ার দৃশ্য দেখে দর্শক
হাততালি দিয়ে, শিস দিয়ে তাঁদের আবেগ ও প্রতীকী সমর্থন
প্রকট করেন। কিন্তু বাস্তবে জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষার্থে আমরা সকলেই কম-বেশি
উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে থাকি।’’
প্রতিবছর অসংখ্য সমিতি, সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান,
ঘটা করে স্বাধীনতা দিবসের দিনটি পালন করে। মূল কাপড়ের পাশাপাশি সেখানে
কাগজের তৈরি ছোট আকারের জাতীয় পতাকা এ মোড় থেকে ও মোড় পর্যন্ত টানিয়ে সেখানকার
পরিবেশটিকে তিন রঙে রাঙিয়ে দেবার রেওয়াজ ও বহু পুরানো, আপাতদৃষ্টিতে তা দৃষ্টিনন্দনও বটে। কিন্তু অনুষ্ঠান পর্ব চুকে
গেলেও সেই সব সমিতি, প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দড়িতে
টাঙানো কাগজের তৈরি জাতীয় পতাকা খুলে নেবার প্রয়োজন মনে করে না! ‘‘অগাস্ট মাস এমনিতেই বর্ষণ-মুখর মাস, সেই
বর্ষার জলে কাগজের তৈরি জাতীয় পতাকা ভিজে সপসপে হয়ে রাস্তায় খসে খসে পড়ে’’ ফলত: স্বাধীনতা দিবস পালনের পরের দিনটি অর্থাৎ ১৬ অগাস্ট থেক বেশ
কিছুদিন পর্যন্ত রাস্তা-ঘাটের ধুলো-ময়লার সাথে দোমড়ানো-মোচড়ানো কিম্বা ছেঁড়া জাতীয়
পতাকার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যা সত্যিই অন্তত: বে মানান ও দৃষ্টিকটু। যেখানে কর্পোরেশন বা
পুরসভার পক্ষ থেকে আবর্জনা ঝেঁটানোর ব্যবস্থা আছে সেখানে আবর্জনার সাথে সাথে জাতীয়
পতাকাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়, অতঃপর তা চলে যায় আবর্জনা
ফেলার নির্দিষ্ট জায়গায়, অনেক সময় আবার অগ্নিগর্ভেও। আর যেখানে তেমন ব্যবস্থা
নেই, সেখানে তার ওপর দিয়ে যানবাহন, পশু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত দিব্যি
যাতায়াত করেন।
কাগজের
পতাকার পাশাপাশি আজকাল আবার পলিথিনের পতাকারও বাজার, যা
গরু ছাগলেও খায় না — খেলে পরে হয়ত জাতীয় পতাকার এই করুন অবস্থা
উপভোগ করার থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যেত। এই পলিথিন সহজে নষ্ট হয় না
তাই অশোকচক্র শোভিত ত্রিবর্ণ পলিথিনের পতাকা দিনের পর দিন অবহেলায় গড়াগড়ি খায় নালা
নর্দমায়, অলিতে গলিতে।
অনেকে এই ঘটনার সম্মুখীন হয়ে দুঃখ পান, এমন মানুষও রয়েছেন যাদের চোখে পড়লে ভূলুণ্ঠিত জাতীয় পতাকা তুলে
সেটিকে কোনও এক পাশে রেখে দেন, এছাড়া কি বা আর করতে পারেন
তাঁরা! কিন্তু এটাই কি সমাধান ?
কচি-কাঁচাদের কিনে দেওয়া কাগজ বা পলিথিনের
পতাকাও এর জন্য কম দায়ী নয়। আমরা সকলে কিন্তু একটু আন্তরিকতা দিয়ে
চেষ্টা করলে এর সমাধান সম্ভব।
স্বাধীনতা দিবস পালনকারী যে সব সমিতি সংগঠন
অগ্রণী ভূমিকা নেয়, তার কর্তাব্যক্তিরা যদি একটু সচেষ্ট হয়ে অনুষ্ঠান পর্ব চুকে
যাওয়ার পর সূর্যাস্তের আগে (বৃষ্টি পড়লে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব) দড়িতে টাঙানো কাগজ বা
পলিথিনের পতাকাগুলি খুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং অভিভাবকেরা কচি-কাঁচাদের বুঝিয়ে
যদি তাদের হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে থাকা জাতীয় পতাকার মর্যাদা, গরিমা, সম্মান সম্পর্কে একটু
শিক্ষা দিতে পারেন তাহলে এই অবাঞ্ছিত দৃশ্য-দূষণ থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া যেতে
পারে।
অনেকের মত কাগজ ও পলিথিনের জাতীয় পতাকার
যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ হলেই ভালো। কিন্তু তা বোধহয় খুব একটা ন্যায় হবে না। কারণ প্রথমত: ১৫ অগাস্টের
পরিবেশটিকে ত্রিবর্ণের ছটায় রঙিন করে তোলার একটি ব্যাপার রয়েছে এবং দ্বিতীয়ত বহু
ছোট-খাটো ব্যবসায়ী এই উপলক্ষে পতাকা বিক্রি করে কিছু আয় করে। তবে যাই হোক না কেন যে
বস্তুটির সঙ্গে জাতীয় সম্মান ও আবেগ জড়িত সেখানে এই ত্রিবর্ণ পতাকার যাতে অসম্মান
না হয় সে সম্পর্কে যত্নবান হওয়াটাও কিন্তু গর্বের। এ বিষয়ে আমাদের সকলকেই
এগিয়ে আসতে হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন