প্রায়শ্চিত্ত
করতে দলমায় আসুন।
বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করে চিত্রাভিনেতা সালমান খান, ক্রিকেটার নবাব পতৌদি একসময় কেমন ফাঁপরে
পড়েছিলেন তা অনেকেই জানেন। এতে অনেকটা সময় জুড়ে সংবাদের শিরোনামে নতুন
ভূমিকায় বারবার উঠে এসেছেন অতীত ও বর্তমানের দুই তারকা। কারণ তাঁরা নামব্জ ব্যক্তি। অগত্যা চক্ষুলজ্জার ভয়ে এঁদের বিরুদ্ধে কড়া
মনোভাব দেখাতে কোমর বেঁধে উঠে পড়ে লেগেছিল দেশীয় প্রশাসন। সংরক্ষিত বন্য-প্রাণী হত্যা অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধ এবং আইনের
ঊর্ধ্বে কেউ থাকতে পারেন না। তবুও এই দুই তারকার উপরেই ভর করে যেন প্রশাসন
জাহির করতে চেয়েছে ‘‘দেখেছো
আমাদের কর্মদক্ষতায় কোনও ফাঁক ফোঁকর নেই।’’ অথচ এই বজ্র আঁটুনির রূপটি দলমা সংলগ্ন
ঝাড়খণ্ডে আজও কার্যত ফস্কা গেরোই বটে।
সংরক্ষিত বন্য প্রাণী হত্যার দায়ে সালমান ও নবাব ঠিক কতটা অন্যায়
করেছিলেন, তাঁরা কোন
শাস্তির উপযুক্ত ছিলেন এই নিয়ে প্রশাসন ও আইনজীবীদের চুলচেরা বিশ্লেষণের খবর আমরা
দেখেছি কিন্তু ঝাড়খণ্ডে এক শ্রেণীর মানুষ বুক ফুলিয়ে হরিণসহ বুনো জন্তু জানোয়ার
শিকার করছেন এবং তা তাদের খাদ্য হিসেবে ‘অধিকার’ বলেও দাবি করছেন। কখনও প্রকাশ্যে আবার কখনও লুকিয়ে চুরিয়ে এই
হত্যা-লীলা দলমায় বছরের পর বছর অব্যাহত অথচ এই দলমাতেই রয়েছে W.W.F.I. সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী আশ্রয়ণী —বুনো জীবজন্তুকে শিকারিদের কবল থেকে রক্ষা
করতে রয়েছে লাখ লাখ টাকার বেতনভোগী কর্মচারীও। কাগজে-কলমে প্রশাসন তথা বন দফতরের বজ্র আঁটুনি ও সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিদের কর্মদক্ষতায় কোনও গাফিলতি নেই বলে মনে হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু
তাঁদের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ থাকছে। স্থানীয় যারা এই হত্যা-লীলার বিপক্ষে তাদের
সঙ্গে আলাপ জমালেই সহজেই অনুমান করা যায় এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক নেতা দ্বারা
প্রভাবিত। সত্যি কথা বলতে কি প্রচারমাধ্যমও এসব
নাম-গোত্রহীন শিকারিদের নিয়ে তেমন উৎসাহিত নয় কারণ এসব অঞ্চলের মানুষ তো আর সালমান
খান বা নবাবের মত কেউকেটা নন বা খবরের কাগজের প্রথম পাতার খোরাকও নন।
—স্থানীয় কিছু মানুষ দলমায় যথেচ্ছ হরিণ, খরগোশ, পেঁচা, লুপ্তপ্রায় বিশালাকায় কাঠবেরালির মত নিরীহ বন্যপ্রাণী মেরে উদরস্থ করছেন, ধ্বস করছেন প্রাকৃতিক ভারসাম্য। অপর দিকে শেয়াল, হায়েনা, নেকড়ের মত জন্তু-জানোয়ার যখন তাদেরই গৃহপালিত পশুর উপর হামলা করছে তখন সেই সব নিরপরাধ বন্য জীব-জন্তুকে বধ করছে হিংস্র আখ্যা দিয়ে। কি অদ্ভুত যুক্তি!
প্রতিবছর ঝাড়খণ্ড-পশ্চিমবঙ্গের দলমা বাঘমুণ্ডী প্রভৃতি পাহাড়ে
পারম্পরিক ‘শিকার
পরবের’ নামে
নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ‘কাটরা হরিণ’সহ দুর্লভ সব জন্তু জানোয়ার। শুধু তাই নয় প্রশাসনের বিধি নিষেধের তোয়াক্কা না করে ভবিষ্যতেও
পারম্পরিক এই জন্তু নিধন যজ্ঞ থামবে না বলে কম্বুকণ্ঠে ঘোষণা করেন সমাজের ঠিকাদার,
দাদা গোছের মানুষ। প্রত্যক্ষে শিকারিদের পিঠ চাপড়ে কিম্বা পরোক্ষে এই গুরুতর
বিষয়টিতে মৌনতা অবলম্বন করে এই হত্যা-লীলায় কার্যত ইন্ধন যোগায় আমাদের রাজনৈতিক
নেতারা। পরিণাম স্বরূপ ফি বছর নিয়ম করে মারা পড়ছে
সংরক্ষিত জন্তু জানোয়ার। ডান-বাম-আঞ্চলিক কোনও রাজনৈতিক দলই কিন্তু
প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলা পছন্দ করেন না। কারণ তাদের রয়েছে সম্প্রদায় বিশেষে জনসমর্থন হারানোর ভয়।
প্রশ্ন হল (১) যারা শিকার করছেন এবং যারা রীতি রেওয়াজের যুক্তি দেখিয়ে এই নিধন যজ্ঞে প্রত্যক্ষে পরোক্ষে মদদ যোগাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকা কেন ? (২) দেশ ও রাজ্যের যে সব নেতা ও রাজনৈতিক দল চাকরি ও নানা ধরণের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সংরক্ষণের ওকালতি করেন, তাঁরা কোন যুক্তিতে বুনো জন্তু-জানোয়ারের সংরক্ষণের বিষয়ে উদাসীন? (৩) পরম্পরাগত রীতি রেওয়াজ বজায় রাখার বিরুদ্ধচারণ না করেই বলছে — যে কোনও সম্প্রদায়ের, যে সকল রীতি রেওয়াজ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা তথা বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী তার প্রতীকী ও বিকল্প ব্যবস্থার উপায় করা কি সম্ভব নয়?
পরিশেষে পূর্ব সিংভূম জেলার দলমা পাহাড় সংলগ্ন পটমদা অঞ্চলের প্রকৃতি
প্রেমী কাদে মাহাতোর বক্তব্য উল্লেখ করে বলি যাঁরা সংরক্ষিত বুনো জন্তু হত্যার
অপরাধে আইনজীবীদের পেছনে টাকা খরচ করছেন তাঁরা সেই টাকা খরচ করুন দলমার বন্য
প্রাণী ও সবুজ সংরক্ষণের সচেতনতা বৃদ্ধির অভিযানে। এতে একদিকে যেমন তাঁদের প্রায়শ্চিত্ত সারা হবে অপর দিকে তাঁরা আর
তিরস্কার নয় বরং পুরস্কারের পাত্র হয়ে উঠবেন প্রকৃতি প্রেমী মানুষের কাছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন