কেউ বলে জয় ‘মাই কি’ কেউ বলে ‘জয় মাও কি’
বাণীপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়
আর সব জায়গার মত ছো-ঝুমুরের মুক্তাঞ্চল সিংভূমেও সপরিবারে আসবেন মা দশভুজা। কাশফুল
ফোটার সাথে সাথে বার্ষিক এই প্রতীক্ষার কাউন্ট-ডাউন শুরু হয়ে গেছে শহরে। সিংভূমের প্রাণকেন্দ্র ইস্পাতনগরী জামশেদপুর ছাড়িয়ে হাইওয়ে ধরে রাঁচি, কলকাতা, চাইবাসা, চাণ্ডিল, পুরুলিয়া যেদিকেই এগোও দু-পাশের সদ্য বর্ষায় তরতাজা সবুজ প্রান্তর কাশে-আকাশে একেবারে মাখামাখি হয়ে জানান দিচ্ছে আসছে পুজো। ইতিমধ্যেই বোনাসের উত্তাপে শহর জামশেদপুরে গাড় হয়েছে পুজোর রঙ, মাথা তুলছে বিশাল বিশাল সব পুজো মণ্ডপের কাঠামো, ইস্পাতনগরীর ঝাঁ চকচকে বাজারগুলিতে কেনাকাটা শুরু হয়েছে জোর কদমে। বিপরীতে দুই সিংভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জের ছবিটা একেবারে ভিন্ন।
শরত ও প্রকৃতির রূপ লাবণ্য ছাড়া গাঁও-দেহাতের হাট বাজার দেখে বোঝার উপায় নেই দশভুজার পূজা আসন্ন। রাজ্য
আলাদা হলেও এ মুলুকে ফেরেনি অপু দুর্গা এবং তাদের মা-বাবা- জ্ঞাতি গুষ্টির বরাত। এই লৌহ
পিঞ্জরে অমুক গোষ্ঠী তমুক গোষ্ঠী কারখানা খুললে আখেরে লাভ কাদের ? আর কতকাল গাঁয়ের কিশোরী, জোয়ান মরদেরা শহরে রেজা-কুলী হয়ে গতর ঝরাবেন— মঙ্গল, বুধরাম, শুকুরমনী, ফুলবারী মাসিদের চোখে এ প্রশ্ন শিউলি ফুলের মত তরতাজা শরতের মিঠে রোদ্দুরেও। বস্তুত
শহর-বাবুরা যখন সপ্তমী-অষ্টমী-নবমীতে কি করবেন না করবেন ভেবে ভেবে অস্থির, তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের হত-দরিদ্র মানুষগুলো ঝিঝির সাথে পাল্লা দিয়ে অনায়াসে গাইতে পারেন ‘‘হেই মাগো দুগ্গা/তোর দশ হাতে অস্তর মিছাই/লুইঠে-পুইঠে লিলো অসুর/হামরা ভুখা পেটে দিন বিতাই ...’’
টুসুপরব ও দুর্গোৎসব — মন মাতাল করা এই দুই পরবে অঙ্গে নতুন বস্ত্র চাপাবেন — এমন ‘বিলাসিতা’ দেখানোর মত খুব কম মানুষই রয়েছেন সিংভূমের টাঁড়-টিকরে। ফি বছর
খরা-বন্যা-কর্মহীনতা-শিক্ষার অভাব সর্বোপরি সরকারি অবহেলা মানুষগুলোকে প্রতিদিন দুই বেলা দু মুঠো ভাত নয় নাই জোটালো; তা বলে কি পুজো হবে না অসুর-নাশিনী মায়ের! দরিদ্রতার পাঁকে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকেও কিন্তু শারদ-লগ্নে মণ্ডপ ও মায়ের মূর্তি গড়ার টাকা কুড়িয়ে বাড়িয়ে জোগাড় করেই নেন পুজো আয়োজনকারী সমিতির মাতৃভক্তরা। আকার
আয়তনের নিরিখে সে দুর্গোৎসব যতই ছোট হোক না কেন, তাকে কেন্দ্র করে অঞ্জলি, পংক্তিভোজ, পালা গান, ছো-নাচ, মোরগ লড়াই প্রভৃতির মধ্যে দিয়েই আনন্দে মেতে ওঠেন গাঁয়ের মানুষ। অবশ্য
যে সব আয়োজনে প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে রাজনৈতিক মুনাফা কামানোর তাগিদ বা হস্তক্ষেপ থাকে বলাই বাহুল্য তার জৌলুস হয় একটু অন্য ধারার বা নজর কাড়া।
কাজের অভাবে স্বভূমি ত্যাগ করে অন্যত্র পাড়ি দেওয়া থেকে মুক্ত নয় দুই সিংভূমের মানুষও। কিন্তু
কাশে-আকাশে শরতের রঙ দানা বাঁধতেই সেই ‘পালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মনটা কেমন যেন মাদলের তালে তালে লাট খায় জন্ম-ভিটের আনাচে-কানাচে। কেউ
কেউ থাকতে না পেরে ‘জয় দুর্গা মাই কি’ বলে চলেও আসেন স্বভূমের আনন্দমেলায় — তারপর চারটে দিন নির্ভেজাল আনন্দে কাটিয়ে আবার তারা এক বুক আক্ষেপ নিয়ে ফিরে যায় তাদের কর্মস্থল কোনও এক শহরের ঝুপড়ি হোটেল, গ্যারাজ কিম্বা সুদূর অসমের চা বাগিচায় ‘নামাল’ খাটতে। অনেকে তো আবার কোথায় যে চলে যায় কেউ তা জানে না। হয়ত
তাদের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ গোপন ডেরায় বসে সারাটা বছর বন্দুক হাতে জপ করেন ‘জয় মাও কি’ আর এটাই দুই সিংভূমের ডুমুরিয়া, বাঘুরিয়া, গুড়াবেন্দা, পটমদা, কুইয়ানি, আঁধারঝোরের মত অজস্র ও আজন্ম পিছিয়ে থাকা গাঁও দেহাতের পুজোর জীবন্ত থিম
— যা স্বাধীনতার ৬৪ বছর অতিক্রান্তেও বদলায়নি এতটুকুও