মঙ্গলবার, ৬ মার্চ, ২০১২


ঝাড়খণ্ডের হোলি
ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে
বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

    রূপবতী পলাশের আঁতুড় ঘর ঝাড়খণ্ডে ‘দোল’ বা ‘হোলির’ মেজাজই অন্যরকম। আগুন পোহানোর দিন কাটতে না কাটতেই গ্রাম ঝাড়খণ্ডের আনাচে কানাচে হুড়মুড় করে ভিড় করে ‘ফাগুন’, আর নির্দিষ্ট তিথির দোলের অনেক আগে থাকতেই শুরু হয়ে যায় ঝাড়খণ্ডের পাহাড় জঙ্গল বিস্তীর্ণ অঞ্চল রঙিন হবার খেলা। সেই মনোহারী রঙে কোনও কৃত্রিমতা নেই।

     গ্রাম ঝাড়খণ্ডে হোলি নিয়ে তেমন একটা মাতামাতি না থাকলেও প্রকৃতি যেন এই সময়ে দুহাত ভরে রঙ ঢেলে দেয় জঙ্গল পাহাড়ের মাথায়। জঙ্গল পাহাড়ের বুকে এই সময়টা যেন যৌবনের প্লাবন। সবুজ, বেগুনি তুঁ‍তে রঙের কচি পাতার ছড়াছড়ি। আর তারই মাঝে বাসন্তী-কমলা-লাল রঙের ফোয়ারা ছুটিয়ে পলাশ, শিমুল, করঞ্জের দঙ্গল গেয়ে ওঠে কবিগুরুর গান ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে।’ শাল, কুড়চি, জিহুর, ধাতকী ফুলও তার মন-মাতানো সৌরভ নিয়ে এই বসন্তোৎসবে শামিল একেবারে হৈ হৈ করে।

     রাজ্য বিভাজন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মত বহু উৎসব ও পরব নিজের গতি-প্রকৃতি বদল করলেও হোলি কিন্তু একই রয়ে গেছে ঝাড়খণ্ডে। পূর্ণিমা ছাড়ার পরেই হোলি খেলেন হিন্দিভাষী মানুষ আর বাঙালিদের কাছে পূর্ণিমা দিনটি দোল পূর্ণিমা বলেই পরিচিত। অতসব ব্যাকরণ বিচারে যেতে নারাজ উৎসাহী ছেলেপিলের দল। তাদের সাফ কথা দু-দিনই তারা রঙ নিয়ে মাখিয়ে দেবে এর তার মুখে।

    রাজ্যের শহরাঞ্চলে বিশেষ করে শিল্প-প্রধান শহরগুলিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বসবাস করেন বিহার রাজ্যের মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই সে রাজ্যের মত, ঝাড়খণ্ডেও ক্ষেত্র বিশেষে হোলি ঘিরে প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে যায় সেই বসন্ত পঞ্চমী অর্থাৎ বাগদেবীর আরাধনার দিনটি থেকেই। মন্দিরে, আখড়ায় ঢোল-খঞ্জনির তালে তালে তাই এখন আমার শহর জামশেদপুরেও ভোজপুরী ফাগুন সংগীতের রমরমা। হোলির দিনটি থেকেই শুরু হয় নতুন বছরের, তাই হোলি উপলক্ষে বিহারী ভাইদের ঘরে খাওয়া-দাওয়ার লোভনীয় ব্যবস্থার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকেন আত্মীয়-স্বজনের মতন তাদের প্রতিবেশী বাঙালিরাও।

     আজকাল সাবেকী ধাতব পিচকারির বদলে বাজার দখল নিয়েছে প্লাস্টিকের তৈরি পিচকারি। লম্বাটে পরিচিত আকার থেকে শুরু করে বন্দুক, সবজি, পেন, ফলমূল অনেক কিছুই মিলবে। ‘গ্ল্যামরমুখী’ যুগে ত্বকের ক্ষতি না হয়ে যায় সে ব্যাপারে সচেতনতা বেড়েছে মেয়েদের। বাছ-বিচার করে তবেই প্রিয়-অপ্রিয় জনের হাতে রঙ মাখতে গাল বাড়িয়ে দেয় তারা। পলাশের চারণভূমি ঝাড়খণ্ডের লৌহ-বলয় জামশেদপুরে আজও অল্পবিস্তর রয়ে গেছে পলাশ ফুল সংগ্রহ করে রঙ তৈরি করার রেওয়াজ,  রয়েছে ‘সিদ্ধি’ খাওয়ার ধুম। ‘হোলিকা দহন’ অর্থাৎ বুড়ির ঘর জ্বালানোর দৃশ্য আজও চোখে পড়ে। হোলির পরেই আবার চুটিয়ে শুরু হয় হোলি মিলন পর্ব। ইফতার পার্টি, বিজয়া দশমীর মত ‘হোলি-মিলনও’ ক্রমে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক জনসমর্থন জোটানোর হাতিয়ার।